শিরোনাম

মদিনাবাসীকে মহানবী (সা.) প্রথম যে বার্তা দিয়েছিলেন

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
মদিনাবাসীকে মহানবী (সা.) প্রথম যে বার্তা দিয়েছিলেন
মদীনা শহরের একটি মসজিদ

মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত শুধু একটি ভৌগোলিক স্থানান্তর ছিল না; বরং তা ছিল এক নতুন মানবিক রাষ্ট্র ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের ঐতিহাসিক শুভ সূচনা। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের আবাসস্থল ছিল মদিনা।

মদিনায় পৌঁছে আল্লাহর রাসুল (সা.) চারটি মানবিক ও আত্মিক মূলনীতির ওপর নগরবাসীর সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। যা পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ইনসাফপূর্ণ ও শান্তির সমাজ।

মদিনার ইহুদি পণ্ডিত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম, যিনি পরে ইসলাম গ্রহণ করেন, তিনি বর্ণনা করেন, ‘আল্লাহর রাসুল যখন প্রথম মদিনায় পদার্পণ করলেন, তখন চারপাশ থেকে মানুষ তার দর্শনের জন্য ভিড় জমাল। আমিও ভিড়ের মধ্যে গিয়ে তার চেহারার দিকে তাকিয়েছি। এক পলক দেখেই আমার অন্তরাত্মা বলে উঠল, এটি কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা হতে পারে না।’

‘তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশে সর্বপ্রথম যে বাণীটি উচ্চারণ করলেন, তা ছিল, ‘হে লোকসকল, তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করো, সমাজে সালামের প্রসার ঘটাও, আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় রাখো এবং রাতে মানুষ যখন গভীর ঘুমে নিমগ্ন থাকে তখন নামাজ (তাহাজ্জুদ) আদায় করো; তবেই তোমরা পরম শান্তিতে বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৮৫)

ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান

একটি সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পূর্বশর্ত হলো– মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা বিধান করা। পেটে ক্ষুধা রেখে কোনো জাতি উন্নত সংস্কৃতি কিংবা নৈতিকতার চর্চা করতে পারে না।

নবীজি (সা.) খুব ভালো করেই জানতেন যে, অভাব ও ক্ষুধা দূর না হলে কোনো রাষ্ট্রের অপরাধ ও সংঘাত বন্ধ করা সম্ভব নয়।

মহানবী (সা.) অন্নসংস্থানকে কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় হিসেবে দেখেননি; বরং একে সামাজিক সুরক্ষার ভিত্তি বানিয়েছেন। তিনি শিখিয়েছেন সমাজের কোনো মানুষ যেন অনাহারে না থাকে, তা নিশ্চিত করাই একটি ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্রের প্রথম পদক্ষেপ।

সালামের প্রসার

রাস্তাঘাটে চলাচলের সময়, কর্মস্থলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা যেকোনো সামাজিক মিলনে পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে একে অপরকে আন্তরিকভাবে অভিবাদন জানানো পারস্পরিক হৃদ্যতা তৈরির সেরা মাধ্যম। অজ্ঞতা ও দূরত্ব থেকেই জন্ম নেয় ভয় এবং সেই ভয় পরবর্তীতে রূপ নেয় বিদ্বেষে।

ইসলামী সম্ভাষণ ‘আসসালামু আলাইকুম’ নিছক কোনো আনুষ্ঠানিক শব্দ নয়; এটি হলো মহান আল্লাহর পবিত্র গুণবাচক নাম ‘আস-সালাম’-এর মাধ্যমে অপর ভাইয়ের নিরাপত্তা ও শান্তি কামনা করা। যখন একজন মানুষ অন্যজনকে বলে,‘আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক’, তখন তা দুজনের মাঝে আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি করে।

আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় রাখা

পরিবার হলো যেকোনো সুস্থ সমাজের ক্ষুদ্রতম অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একক। একটি পরিবার যখন ভাঙনের মুখে পড়ে, আত্মীয়-স্বজনের যোগাযোগ যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন মানুষ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে এবং সামাজিক সুরক্ষাবলয় ভেঙে যায়।

প্রিয় নবী (সা.) রক্তের সম্পর্ক রক্ষা করাকে শুধু নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেই দেখেননি, বরং এটিকে সামাজিক ঐক্যের চাবিকাঠি বানিয়েছেন। নিয়মিত আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া, দূরবর্তী স্বজনদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সুখ-দুঃখে অংশীদার হওয়া সমাজের পারিবারিক মেলবন্ধনকে অক্ষুণ্ণ রাখে।

নিঝুম রাতে নামাজ

সামাজিক দায়িত্ব পালনের তিনটি বাস্তবমুখী নির্দেশের সঙ্গে নবীজি (সা.) যুক্ত করেছেন একটি আত্মিক আমল ‘রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন নামাজ আদায় করো।’ বাহ্যিক সমাজসেবা ও দানশীলতা মানুষকে অনেক সময় অহংকারী করে তুলতে পারে। কিন্তু রাতের নিভৃতে পরম স্রষ্টার সঙ্গে একান্তে কথোপকথন বান্দার অন্তরে এক সঞ্জীবনী শক্তি জোগায়।

রাতের আঁধারে চোখের পানি ফেলে যে মানুষ নিজের অহংকার বিসর্জন দেয়, দিনের আলোয় সে-ই মানুষের কল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার অদম্য প্রেরণা খুঁজে পায়। আত্মিক সংযোগ ছাড়া শুধু বৈষয়িক সমাজসেবা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

/এসআর/