শিরোনাম

খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশই ১০ ব্যাংকে, তালিকায় যারা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশই ১০ ব্যাংকে, তালিকায় যারা
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের শাসনামলে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, প্রভাবশালী গ্রাহকদের ঋণ দেওয়া এবং ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার যে চিত্র তৈরি হয়েছিল, এখন তার বড় অংশই খেলাপি ঋণ হয়ে গেছে। বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোকে দেওয়া বিপুল ঋণের টাকা ফেরত না আসায় মাত্র ১০টি ব্যাংকেই জমেছে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। যা দেশের ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি। এই হিসাবেই বিশ্বে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশ এখন বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনভিত্তিক তথ্য বলছে, ব্যাংক খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে দেওয়া প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই এখন অনাদায়ি বা খেলাপি। মার্চ থেকে জুন - মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

শীর্ষে ইসলামী ব্যাংক

খেলাপি ঋণের অঙ্কে শীর্ষে রয়েছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। গত জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশই এখন খেলাপি।

ব্যাংকটির বড় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে রয়েছে আলোচিত এস আলম গ্রুপ ও এই গ্রুপ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপের হাতে যাওয়ার পর গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব ঋণের বড় অংশের প্রকৃত অবস্থা সামনে আসতে শুরু করে।

জনতা ব্যাংকের ৭৫ শতাংশ ঋণই খেলাপি

খেলাপি ঋণের অঙ্কে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। গত জুনে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশই খেলাপি। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির প্রায় প্রতি চার টাকার ঋণের তিন টাকাই এখন খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।

জনতা ব্যাংকের বড় খেলাপিদের তালিকায় রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের নেতৃত্বাধীন এই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পাশাপাশি এস আলম গ্রুপ ও এননটেক্সের ঋণও ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের বড় অংশজুড়ে রয়েছে।

চার ব্যাংকে প্রায় পুরো ঋণই খেলাপি

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে চার ব্যাংকের অবস্থা আরও নাজুক। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ০৮ শতাংশই খেলাপি। ইউনিয়ন ব্যাংকে এই হার ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ ঋণ খেলাপি।

এই চার ব্যাংকের বড় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে এস আলম ও বেক্সিমকোর পাশাপাশি নাসা ও সিকদারসহ কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নাম রয়েছে।

ন্যাশনাল, আইএফআইসি ও এবি ব্যাংকেও অর্ধেকের বেশি ঋণ খেলাপি

শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকায় থাকা ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও এবি ব্যাংকের অবস্থাও উদ্বেগজনক। ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। আইএফআইসি ব্যাংকে এই হার ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং এবি ব্যাংকে ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ।

এই তিন ব্যাংকের বড় খেলাপিদের তালিকায় রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ, উত্তরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বেঙ্গল গ্রুপ, মাইশা গ্রুপ, বিল্ডট্রেড গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, আশিয়ান সিটি, মাহিন গ্রুপ, আমান গ্রুপ, এরশাদ ব্রাদার্স ও মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি। ব্যাংকটির বড় খেলাপিদের মধ্যে রয়েছে জজ ভূঁইয়া গ্রুপ, জাকিয়া গ্রুপ, মুহিব স্টিল অ্যান্ড শিপ রিসাইক্লিং ও মুন গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

১৬ বছরে ফুলে-ফেঁপে ছয় লাখ কোটি

ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের মতে, খেলাপি ঋণের বর্তমান চিত্র বুঝতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার সময় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতার শেষ দিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।

এরপর ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ্যে আসায় খেলাপি ঋণের হিসাব দ্রুত বাড়তে থাকে। দেশি-বিদেশি নিরীক্ষা, ব্যাংকের সম্পদ পর্যালোচনা এবং ঋণ শ্রেণীকরণে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের ফলে আগে আড়ালে থাকা অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের তথ্যও সামনে আসে। ফলে গত জুনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

ছাড় দিয়েও কমছে না খেলাপি

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানান, বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া ব্যক্তিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থক ব্যবসায়ী। তাঁদের কেউ কারাগারে, কেউ বিদেশে অবস্থান করছেন। ফলে ঋণ আদায়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়ও বড় বাধা তৈরি হয়েছে।

খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃ তফসিল, সুদ মওকুফ ও এককালীন পরিশোধের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছে। এসব উদ্যোগ নেওয়ার পরেও খেলাপি ঋণ পরিশোধের হার বাড়ে।

ব্যাংক ব্যবস্থাপকদের মতে, কাগজে-কলমে ঋণ পুনঃ তফসিল করলেই ব্যাংকের প্রকৃত ঝুঁকি কমে না, বরং দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি থাকা বড় ঋণগুলো আদায় করতে না পারলে ব্যাংকের মূলধন ও তারল্যের ওপর চাপ আরও বাড়বে। এছাড়া বড় ঋণখেলাপিদের অর্থের অধিকাংশ পাচার হয়ে থাকতে পারে অথবা অন্যত্র ব্যয় হয়ে গেছে। সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যবহার করতে হবে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান মনে করেন, দ্রুত ঝুঁকিগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন করা প্রয়োজন। যেসব বড় খেলাপি ঋণ পরিশোধে সাড়া দেবে না, সেগুলো ওই কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করে ঋণগ্রহীতাদের সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

/বিবি/