যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অসম বাণিজ্য চুক্তি
সিটিজেন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অসম বাণিজ্য চুক্তি
সিটিজেন ডেস্ক
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২১: ৩৭

ছবি: বাসস
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের করা ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ নিয়ে বিতর্ক থামছেই না। অনেকের মতে, এই ‘অসম’ বাণিজ্য চুক্তিটি কাগজে-কলমে পারস্পরিক হলেও বাস্তবে এতে বাংলাদেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থই বেশি সুরক্ষিত হয়েছে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, হোয়াইট হাউস এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে চুক্তির ঘোষণা দেয়। পরে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের ওয়েবসাইটে এর পূর্ণ পাঠ প্রকাশ করা হয়। এতে শুল্ক, অশুল্ক বাধা, ডিজিটাল বাণিজ্য, শ্রম অধিকার, পরিবেশ, জাতীয় নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, রাষ্ট্রায়ত্ত খাত ও বাজারপ্রবেশসহ বিস্তৃত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তির তৃতীয় অংশ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এখানে ডিজিটাল বাণিজ্য থেকে শুরু করে জাতীয় নিরাপত্তা, পারমাণবিক সরঞ্জাম, বিনিয়োগ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং পোশাক রপ্তানি পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশকে একাধিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনা হয়েছে।
চুক্তির ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি অংশে বাংলাদেশের জন্য প্রথম বড় সীমাবদ্ধতা এসেছে ডিজিটাল সেবা করের প্রশ্নে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আইনগতভাবে বা বাস্তবে এমন কোনো ডিজিটাল সেবা কর আরোপ করতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক বলে বিবেচিত হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে ডিজিটাল অর্থনীতি ঘিরে নিজস্ব করনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই অংশে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য সহজতর করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজিটাল পণ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া, সীমান্তের ওপারে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করা। বিষয়টি নিছক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নয়; বরং ডিজিটাল নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ওপর বাহ্যিক প্রভাবের দরজা খুলে দেওয়ার মতো।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ধারা হলো: বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে এমন কোনো দেশের সঙ্গে নতুন ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ‘মৌলিক স্বার্থ’ বিপন্ন করে বলে মনে করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিলের নির্বাহী আদেশ ১৪২৫৭ অনুযায়ী পূর্বের পারস্পরিক শুল্কহারও পুনর্বহাল করতে পারবে। সরল ভাষায়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক কূটনীতির ওপরও এখানে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক প্রভাব রাখা হয়েছে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনের ওপর কোনো শুল্ক আরোপ করবে না। পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায়ও এ ধরনের শুল্ক স্থায়ীভাবে স্থগিত রাখার বহুপক্ষীয় উদ্যোগকে সমর্থন করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে প্রবেশের শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রযুক্তি, উৎপাদন প্রক্রিয়া, সোর্স কোড বা মালিকানাধীন জ্ঞান হস্তান্তর চাওয়া যাবে না। যদিও সরকারি ক্রয়, বাণিজ্যিক চুক্তি বা নির্দিষ্ট তদন্তের ক্ষেত্রে কিছু সীমিত ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
চুক্তির অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা অংশ আরও বেশি স্পর্শকাতর। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো সীমান্তব্যবস্থা বা বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশকে তা জানানো হবে এবং পরামর্শের পর বাংলাদেশকে সেই ব্যবস্থার সমর্থনে পরিপূরক সীমাবদ্ধতামূলক ব্যবস্থা নিতে বা বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাজনিত পদক্ষেপের সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিও সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হবে।
এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশকে এমন তৃতীয় দেশের মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রিত কোম্পানির কার্যক্রম মোকাবিলায়ও ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে, যাদের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে কমদামে পণ্য রপ্তানি বাড়ে, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি কমে যায়, অথবা তৃতীয় দেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিষয়টি কার্যত তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককেও মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে মূল্যায়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা এবং বিনিয়োগ নিরাপত্তা সংক্রান্ত ধারাগুলোতেও বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার কথা বলা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তাসংবেদনশীল প্রযুক্তি ও পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। একই সঙ্গে এমন লেনদেন সীমিত করতে সহযোগিতা করতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়ে। আগত বিনিয়োগ সম্পর্কিত তথ্য বিনিময়ের বাধ্যবাধকতাও এতে রাখা হয়েছে।
অন্যান্য ব্যবস্থা অংশে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজতর করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে বাজার অর্থনীতির দেশগুলোর জাহাজ নির্মাণ ও নৌপরিবহনকে উৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধে দুই দেশ সহযোগিতা চুক্তি করবে। কিন্তু সবচেয়ে আলোচিত ধারা হলো: বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থকে বিপন্ন করে। ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে কেবল সে ক্ষেত্রে, যেখানে বিকল্প সরবরাহকারী নেই বা আগেই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
চুক্তির বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক বিবেচনা অংশে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো খাত উন্মুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। এসব বিনিয়োগকে এমন শর্তে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে, যা বাংলাদেশের নিজস্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের তুলনায় কম অনুকূল হবে না। অর্থাৎ মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যত অগ্রাধিকারমূলক নিশ্চয়তা রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বা নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও কঠোর শর্ত রয়েছে। বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে, এসব প্রতিষ্ঠান পণ্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক বিবেচনায় চলবে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ও সেবার বিরুদ্ধে বৈষম্য করবে না এবং দেশীয় উৎপাদকদের ভর্তুকি দেবে না। লিখিত অনুরোধ করলে যুক্তরাষ্ট্রকে এসব ভর্তুকি বা অ-বাণিজ্যিক সহায়তার তথ্যও দিতে হবে। এর মানে, বাংলাদেশের শিল্পনীতি ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা ব্যবস্থাও বাইরের নজরদারির আওতায় পড়তে পারে।
পোশাক খাতে কিছু সুবিধার ইঙ্গিত থাকলেও সেটিও পুরোপুরি শর্তসাপেক্ষ। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বাংলাদেশের নির্দিষ্ট বস্ত্র ও পোশাকপণ্যকে শূন্য পারস্পরিক শুল্কহারে প্রবেশের সুযোগ দিতে একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। তবে সেই সুবিধার পরিমাণ নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও মানবসৃষ্ট তন্তুভিত্তিক বস্ত্র উপাদান আমদানির ওপর। অর্থাৎ বাংলাদেশের পোশাক খাতকে মার্কিন উপকরণের ওপর আরও নির্ভরশীল করার একটি কৌশল এখানে স্পষ্ট।
সবশেষে, প্রয়োগ ও চূড়ান্ত বিধান অংশে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের শাস্তিমূলক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে বাংলাদেশ চুক্তির কোনো ধারা মানেনি, তাহলে পরামর্শের পর সন্তোষজনক সমাধান না এলে বাংলাদেশের কিছু বা সব পণ্যের ওপর আবারও আগের শুল্কহার আরোপ করতে পারবে। অন্যদিকে, যেকোনো পক্ষ লিখিত নোটিশ দিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে চুক্তি বাতিলও করতে পারবে।
সব মিলিয়ে চুক্তিটির তৃতীয় অংশে যে চিত্র ফুটে উঠছে, তা হলো বাংলাদেশকে একাধিক কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও নীতিগত বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ করা হয়েছে, আর বিনিময়ে যে সুবিধার কথা বলা হয়েছে, তার বেশিরভাগই শর্তযুক্ত, সীমিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনানির্ভর। তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এটি আদৌ সমতার ভিত্তিতে করা কোনো পারস্পরিক চুক্তি, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষার একটি কাঠামো?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের করা ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ নিয়ে বিতর্ক থামছেই না। অনেকের মতে, এই ‘অসম’ বাণিজ্য চুক্তিটি কাগজে-কলমে পারস্পরিক হলেও বাস্তবে এতে বাংলাদেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থই বেশি সুরক্ষিত হয়েছে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, হোয়াইট হাউস এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে চুক্তির ঘোষণা দেয়। পরে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের ওয়েবসাইটে এর পূর্ণ পাঠ প্রকাশ করা হয়। এতে শুল্ক, অশুল্ক বাধা, ডিজিটাল বাণিজ্য, শ্রম অধিকার, পরিবেশ, জাতীয় নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, রাষ্ট্রায়ত্ত খাত ও বাজারপ্রবেশসহ বিস্তৃত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তির তৃতীয় অংশ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এখানে ডিজিটাল বাণিজ্য থেকে শুরু করে জাতীয় নিরাপত্তা, পারমাণবিক সরঞ্জাম, বিনিয়োগ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং পোশাক রপ্তানি পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশকে একাধিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনা হয়েছে।
চুক্তির ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি অংশে বাংলাদেশের জন্য প্রথম বড় সীমাবদ্ধতা এসেছে ডিজিটাল সেবা করের প্রশ্নে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আইনগতভাবে বা বাস্তবে এমন কোনো ডিজিটাল সেবা কর আরোপ করতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক বলে বিবেচিত হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে ডিজিটাল অর্থনীতি ঘিরে নিজস্ব করনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই অংশে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য সহজতর করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজিটাল পণ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া, সীমান্তের ওপারে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করা। বিষয়টি নিছক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নয়; বরং ডিজিটাল নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ওপর বাহ্যিক প্রভাবের দরজা খুলে দেওয়ার মতো।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ধারা হলো: বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে এমন কোনো দেশের সঙ্গে নতুন ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ‘মৌলিক স্বার্থ’ বিপন্ন করে বলে মনে করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিলের নির্বাহী আদেশ ১৪২৫৭ অনুযায়ী পূর্বের পারস্পরিক শুল্কহারও পুনর্বহাল করতে পারবে। সরল ভাষায়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক কূটনীতির ওপরও এখানে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক প্রভাব রাখা হয়েছে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনের ওপর কোনো শুল্ক আরোপ করবে না। পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায়ও এ ধরনের শুল্ক স্থায়ীভাবে স্থগিত রাখার বহুপক্ষীয় উদ্যোগকে সমর্থন করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে প্রবেশের শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রযুক্তি, উৎপাদন প্রক্রিয়া, সোর্স কোড বা মালিকানাধীন জ্ঞান হস্তান্তর চাওয়া যাবে না। যদিও সরকারি ক্রয়, বাণিজ্যিক চুক্তি বা নির্দিষ্ট তদন্তের ক্ষেত্রে কিছু সীমিত ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
চুক্তির অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা অংশ আরও বেশি স্পর্শকাতর। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো সীমান্তব্যবস্থা বা বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশকে তা জানানো হবে এবং পরামর্শের পর বাংলাদেশকে সেই ব্যবস্থার সমর্থনে পরিপূরক সীমাবদ্ধতামূলক ব্যবস্থা নিতে বা বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাজনিত পদক্ষেপের সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিও সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হবে।
এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশকে এমন তৃতীয় দেশের মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রিত কোম্পানির কার্যক্রম মোকাবিলায়ও ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে, যাদের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে কমদামে পণ্য রপ্তানি বাড়ে, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি কমে যায়, অথবা তৃতীয় দেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিষয়টি কার্যত তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককেও মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে মূল্যায়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা এবং বিনিয়োগ নিরাপত্তা সংক্রান্ত ধারাগুলোতেও বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার কথা বলা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তাসংবেদনশীল প্রযুক্তি ও পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। একই সঙ্গে এমন লেনদেন সীমিত করতে সহযোগিতা করতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়ে। আগত বিনিয়োগ সম্পর্কিত তথ্য বিনিময়ের বাধ্যবাধকতাও এতে রাখা হয়েছে।
অন্যান্য ব্যবস্থা অংশে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজতর করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে বাজার অর্থনীতির দেশগুলোর জাহাজ নির্মাণ ও নৌপরিবহনকে উৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধে দুই দেশ সহযোগিতা চুক্তি করবে। কিন্তু সবচেয়ে আলোচিত ধারা হলো: বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থকে বিপন্ন করে। ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে কেবল সে ক্ষেত্রে, যেখানে বিকল্প সরবরাহকারী নেই বা আগেই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
চুক্তির বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক বিবেচনা অংশে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো খাত উন্মুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। এসব বিনিয়োগকে এমন শর্তে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে, যা বাংলাদেশের নিজস্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের তুলনায় কম অনুকূল হবে না। অর্থাৎ মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যত অগ্রাধিকারমূলক নিশ্চয়তা রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বা নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও কঠোর শর্ত রয়েছে। বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে, এসব প্রতিষ্ঠান পণ্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক বিবেচনায় চলবে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ও সেবার বিরুদ্ধে বৈষম্য করবে না এবং দেশীয় উৎপাদকদের ভর্তুকি দেবে না। লিখিত অনুরোধ করলে যুক্তরাষ্ট্রকে এসব ভর্তুকি বা অ-বাণিজ্যিক সহায়তার তথ্যও দিতে হবে। এর মানে, বাংলাদেশের শিল্পনীতি ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা ব্যবস্থাও বাইরের নজরদারির আওতায় পড়তে পারে।
পোশাক খাতে কিছু সুবিধার ইঙ্গিত থাকলেও সেটিও পুরোপুরি শর্তসাপেক্ষ। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বাংলাদেশের নির্দিষ্ট বস্ত্র ও পোশাকপণ্যকে শূন্য পারস্পরিক শুল্কহারে প্রবেশের সুযোগ দিতে একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। তবে সেই সুবিধার পরিমাণ নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও মানবসৃষ্ট তন্তুভিত্তিক বস্ত্র উপাদান আমদানির ওপর। অর্থাৎ বাংলাদেশের পোশাক খাতকে মার্কিন উপকরণের ওপর আরও নির্ভরশীল করার একটি কৌশল এখানে স্পষ্ট।
সবশেষে, প্রয়োগ ও চূড়ান্ত বিধান অংশে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের শাস্তিমূলক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে বাংলাদেশ চুক্তির কোনো ধারা মানেনি, তাহলে পরামর্শের পর সন্তোষজনক সমাধান না এলে বাংলাদেশের কিছু বা সব পণ্যের ওপর আবারও আগের শুল্কহার আরোপ করতে পারবে। অন্যদিকে, যেকোনো পক্ষ লিখিত নোটিশ দিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে চুক্তি বাতিলও করতে পারবে।
সব মিলিয়ে চুক্তিটির তৃতীয় অংশে যে চিত্র ফুটে উঠছে, তা হলো বাংলাদেশকে একাধিক কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও নীতিগত বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ করা হয়েছে, আর বিনিময়ে যে সুবিধার কথা বলা হয়েছে, তার বেশিরভাগই শর্তযুক্ত, সীমিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনানির্ভর। তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এটি আদৌ সমতার ভিত্তিতে করা কোনো পারস্পরিক চুক্তি, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষার একটি কাঠামো?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অসম বাণিজ্য চুক্তি
সিটিজেন ডেস্ক
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২১: ৩৭

ছবি: বাসস
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের করা ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ নিয়ে বিতর্ক থামছেই না। অনেকের মতে, এই ‘অসম’ বাণিজ্য চুক্তিটি কাগজে-কলমে পারস্পরিক হলেও বাস্তবে এতে বাংলাদেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থই বেশি সুরক্ষিত হয়েছে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, হোয়াইট হাউস এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে চুক্তির ঘোষণা দেয়। পরে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের ওয়েবসাইটে এর পূর্ণ পাঠ প্রকাশ করা হয়। এতে শুল্ক, অশুল্ক বাধা, ডিজিটাল বাণিজ্য, শ্রম অধিকার, পরিবেশ, জাতীয় নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, রাষ্ট্রায়ত্ত খাত ও বাজারপ্রবেশসহ বিস্তৃত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তির তৃতীয় অংশ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এখানে ডিজিটাল বাণিজ্য থেকে শুরু করে জাতীয় নিরাপত্তা, পারমাণবিক সরঞ্জাম, বিনিয়োগ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং পোশাক রপ্তানি পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশকে একাধিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনা হয়েছে।
চুক্তির ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি অংশে বাংলাদেশের জন্য প্রথম বড় সীমাবদ্ধতা এসেছে ডিজিটাল সেবা করের প্রশ্নে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আইনগতভাবে বা বাস্তবে এমন কোনো ডিজিটাল সেবা কর আরোপ করতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক বলে বিবেচিত হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে ডিজিটাল অর্থনীতি ঘিরে নিজস্ব করনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই অংশে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য সহজতর করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজিটাল পণ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া, সীমান্তের ওপারে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করা। বিষয়টি নিছক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নয়; বরং ডিজিটাল নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ওপর বাহ্যিক প্রভাবের দরজা খুলে দেওয়ার মতো।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ধারা হলো: বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে এমন কোনো দেশের সঙ্গে নতুন ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ‘মৌলিক স্বার্থ’ বিপন্ন করে বলে মনে করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিলের নির্বাহী আদেশ ১৪২৫৭ অনুযায়ী পূর্বের পারস্পরিক শুল্কহারও পুনর্বহাল করতে পারবে। সরল ভাষায়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক কূটনীতির ওপরও এখানে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক প্রভাব রাখা হয়েছে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনের ওপর কোনো শুল্ক আরোপ করবে না। পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায়ও এ ধরনের শুল্ক স্থায়ীভাবে স্থগিত রাখার বহুপক্ষীয় উদ্যোগকে সমর্থন করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে প্রবেশের শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রযুক্তি, উৎপাদন প্রক্রিয়া, সোর্স কোড বা মালিকানাধীন জ্ঞান হস্তান্তর চাওয়া যাবে না। যদিও সরকারি ক্রয়, বাণিজ্যিক চুক্তি বা নির্দিষ্ট তদন্তের ক্ষেত্রে কিছু সীমিত ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
চুক্তির অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা অংশ আরও বেশি স্পর্শকাতর। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো সীমান্তব্যবস্থা বা বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশকে তা জানানো হবে এবং পরামর্শের পর বাংলাদেশকে সেই ব্যবস্থার সমর্থনে পরিপূরক সীমাবদ্ধতামূলক ব্যবস্থা নিতে বা বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাজনিত পদক্ষেপের সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিও সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হবে।
এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশকে এমন তৃতীয় দেশের মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রিত কোম্পানির কার্যক্রম মোকাবিলায়ও ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে, যাদের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে কমদামে পণ্য রপ্তানি বাড়ে, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি কমে যায়, অথবা তৃতীয় দেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিষয়টি কার্যত তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককেও মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে মূল্যায়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা এবং বিনিয়োগ নিরাপত্তা সংক্রান্ত ধারাগুলোতেও বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার কথা বলা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তাসংবেদনশীল প্রযুক্তি ও পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। একই সঙ্গে এমন লেনদেন সীমিত করতে সহযোগিতা করতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়ে। আগত বিনিয়োগ সম্পর্কিত তথ্য বিনিময়ের বাধ্যবাধকতাও এতে রাখা হয়েছে।
অন্যান্য ব্যবস্থা অংশে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজতর করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে বাজার অর্থনীতির দেশগুলোর জাহাজ নির্মাণ ও নৌপরিবহনকে উৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধে দুই দেশ সহযোগিতা চুক্তি করবে। কিন্তু সবচেয়ে আলোচিত ধারা হলো: বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থকে বিপন্ন করে। ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে কেবল সে ক্ষেত্রে, যেখানে বিকল্প সরবরাহকারী নেই বা আগেই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
চুক্তির বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক বিবেচনা অংশে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো খাত উন্মুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। এসব বিনিয়োগকে এমন শর্তে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে, যা বাংলাদেশের নিজস্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের তুলনায় কম অনুকূল হবে না। অর্থাৎ মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যত অগ্রাধিকারমূলক নিশ্চয়তা রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বা নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও কঠোর শর্ত রয়েছে। বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে, এসব প্রতিষ্ঠান পণ্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক বিবেচনায় চলবে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ও সেবার বিরুদ্ধে বৈষম্য করবে না এবং দেশীয় উৎপাদকদের ভর্তুকি দেবে না। লিখিত অনুরোধ করলে যুক্তরাষ্ট্রকে এসব ভর্তুকি বা অ-বাণিজ্যিক সহায়তার তথ্যও দিতে হবে। এর মানে, বাংলাদেশের শিল্পনীতি ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা ব্যবস্থাও বাইরের নজরদারির আওতায় পড়তে পারে।
পোশাক খাতে কিছু সুবিধার ইঙ্গিত থাকলেও সেটিও পুরোপুরি শর্তসাপেক্ষ। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বাংলাদেশের নির্দিষ্ট বস্ত্র ও পোশাকপণ্যকে শূন্য পারস্পরিক শুল্কহারে প্রবেশের সুযোগ দিতে একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। তবে সেই সুবিধার পরিমাণ নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও মানবসৃষ্ট তন্তুভিত্তিক বস্ত্র উপাদান আমদানির ওপর। অর্থাৎ বাংলাদেশের পোশাক খাতকে মার্কিন উপকরণের ওপর আরও নির্ভরশীল করার একটি কৌশল এখানে স্পষ্ট।
সবশেষে, প্রয়োগ ও চূড়ান্ত বিধান অংশে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের শাস্তিমূলক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে বাংলাদেশ চুক্তির কোনো ধারা মানেনি, তাহলে পরামর্শের পর সন্তোষজনক সমাধান না এলে বাংলাদেশের কিছু বা সব পণ্যের ওপর আবারও আগের শুল্কহার আরোপ করতে পারবে। অন্যদিকে, যেকোনো পক্ষ লিখিত নোটিশ দিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে চুক্তি বাতিলও করতে পারবে।
সব মিলিয়ে চুক্তিটির তৃতীয় অংশে যে চিত্র ফুটে উঠছে, তা হলো বাংলাদেশকে একাধিক কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও নীতিগত বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ করা হয়েছে, আর বিনিময়ে যে সুবিধার কথা বলা হয়েছে, তার বেশিরভাগই শর্তযুক্ত, সীমিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনানির্ভর। তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এটি আদৌ সমতার ভিত্তিতে করা কোনো পারস্পরিক চুক্তি, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষার একটি কাঠামো?
/এমআর/




