শিরোনাম

হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রকে হুল ফোটাচ্ছে ইরানের ‘মশা বাহিনী’

সিটিজেন ডেস্ক
হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রকে হুল ফোটাচ্ছে ইরানের ‘মশা বাহিনী’
অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রসজ্জিত ইরানের ছোট ছোট স্পিডবোট। সামরিক বিশ্লেষকরা এর নাম দিয়েছে মশা নৌবহর। ছবি: তাসনিম নিউজ

হাতি ঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে হরমুজ প্রণালিতে এখন আসলে ‘মশা’র রাজত্বই চলছে। বাংলা প্রবাদটিকে সত্য প্রমাণ করে বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের সুসজ্জিত আধুনিক নৌবহরকে হুল ফুটিয়ে হরমুজ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে ইরানের ‘মশা বাহিনী’।

‘মশা বাহিনী’ আসলে কী

পারস্য উপসাগরের উত্তাল জলে সূর্য যখন ঢলে পড়ে, তখন ইরানের দক্ষিণ উপকূলের গুহা, খাঁড়ি আর পাহাড়ঘেরা ছোট ছোট ঘাঁটি থেকে হঠাৎ বের হয়ে আসে তীব্র গতির শত শত ক্ষুদ্র নৌযান। দূর থেকে সেগুলোকে তেমন ভয়ংকর মনে হয় না—কেউ হয়তো ভাবতে পারেন, এ তো সাধারণ স্পিডবোট। কিন্তু এই ছোট নৌযানগুলোর সম্মিলিত উপস্থিতিই আজ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মার্কিন নৌবাহিনীকেও অস্বস্তিতে ফেলেছে। সামরিক বিশ্লেষকেরা ইরানের এই ছোট নৌযানের বহরের নাম দিয়েছেন–মশা নৌবহর।

যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় যুদ্ধজাহাজের বিপরীতে ইরানের এই কৌশল যেন একেবারে ভিন্ন দর্শনের। এখানে শক্তির প্রদর্শন নেই, আছে ধৈর্যের খেলা; নেই বিশাল বিমানবাহী রণতরী, আছে অসংখ্য ছোট নৌযানের বহর। আর সেই বহরই এখন বৈশ্বিক তেল পরিবহন ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলেছে ।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের প্রচলিত নৌবাহিনী অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তাদের বড় যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন ও সামরিক ঘাঁটির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত দাবি করেছেন, ইরানের নৌবাহিনী, ‘সমুদ্রের তলদেশে পড়ে আছে।’ কিন্তু বাস্তবতা হলো – ইরানের আসল শক্তি কখনোই বড় যুদ্ধজাহাজে ছিল না।

তেহরান আগেই বুঝে গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি সমুদ্রযুদ্ধে নামা আত্মঘাতী। তাই তারা বেছে নিয়েছে অসম যুদ্ধের গুপ্ত কৌশল। আর সেই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পরিচালিত ছোট, দ্রুতগামী ও সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য নৌযান।

এই ধরনের দুই-একটি নৌযান খুব বেশি ভয়ংকর নয়। কিন্তু যখন ২০, ৩০ কিংবা ৪০টি নৌযান একসঙ্গে আসে, তখন পরিস্থিতি বদলে যায়। তারা তেলবাহী ট্যাংকার ঘিরে ফেলতে পারে, যুদ্ধজাহাজকে বিভ্রান্ত করতে পারে, এমনকি সমুদ্রপথে মাইনও পেতে রাখতে পারে।

এই ধরনের দুই-একটি নৌযান খুব বেশি ভয়ংকর নয়। কিন্তু যখন ২০, ৩০ কিংবা ৪০টি নৌযান একসঙ্গে আসে, তখন পরিস্থিতি বদলে যায়। তারা তেলবাহী ট্যাংকার ঘিরে ফেলতে পারে, যুদ্ধজাহাজকে বিভ্রান্ত করতে পারে, এমনকি সমুদ্রপথে মাইনও পেতে রাখতে পারে। দেখতে ছোট হলেও এগুলো অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। এতে মেশিনগান, রকেট, অ্যান্টি-শিপ মিসাইল এমনকি আত্মঘাতী ড্রোনও থাকে।

এসব নৌযান বিশ্বের জ্বালানি অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করছে । কারণ হরমুজ প্রণালি পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র পথ। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানের মূল লক্ষ্য পুরো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং এমন এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা, যাতে জাহাজ মালিক ও বিমা কোম্পানিগুলো আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কয়েকটি ড্রোন হামলা কিংবা ছোট নৌযানে ধাওয়া—এটুকুই যথেষ্ট আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরির জন্য।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল বলেন, ‘ইরানকে প্রতিটি জাহাজে আঘাত করতে হবে না। শুধু এতটুকু দেখাতে হবে যে তারা আঘাত করতে সক্ষম। তাহলেই বিমা বাজারে আতঙ্ক তৈরি হবে।’

এই কৌশলকে অনেকেই গেরিলা যুদ্ধের সামুদ্রিক সংস্করণ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। পাহাড়ি উপকূল, সরু জলপথ এবং অসংখ্য গোপন ঘাঁটি—সব মিলিয়ে ভৌগোলিক সুবিধাও ইরানের পক্ষে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ হয়তো সমুদ্রে শক্তিশালী, কিন্তু প্রতিটি ছোট নৌযান খুঁজে বের করা তাদের জন্য কঠিন ও ব্যয়বহুল।

এই কৌশলকে অনেকেই গেরিলা যুদ্ধের সামুদ্রিক সংস্করণ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। পাহাড়ি উপকূল, সরু জলপথ এবং অসংখ্য গোপন ঘাঁটি—সব মিলিয়ে ভৌগোলিক সুবিধাও ইরানের পক্ষে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ হয়তো সমুদ্রে শক্তিশালী, কিন্তু প্রতিটি ছোট নৌযান খুঁজে বের করা তাদের জন্য কঠিন ও ব্যয়বহুল।

সামরিক বিশেষজ্ঞ নিক চাইল্ডসের ভাষায়, ‘মশা নৌবহরের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—আপনি কখনো নিশ্চিত হতে পারবেন না যে কোনো ছোট নৌযান আপনার নজর এড়িয়ে যাবে না।’

আইআরজিসি শুধু ছোট নৌযানেই থেমে নেই ইরান। তারা ব্যবহার করছে ড্রোন বোট, ছোট সাবমেরিন, উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছদ্মবেশী মাছ ধরার নৌকাও। অনেক সময় সাধারণ জেলে নৌকা মাইন পেতে রাখার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে কোনটি বেসামরিক আর কোনটি সামরিক—তা বোঝাই কঠিন হয়ে উঠছে।

হাডসন ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পুরো কৌশল এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে শক্রর ওপর ধীরে ধীরে চাপ সৃষ্টি করা যায়। লক্ষ্য সরাসরি যুদ্ধ জেতা নয়; বরং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত, বিভ্রান্ত ও ব্যয়বহুল অবস্থায় ফেলে দেওয়া।

ইরানের আরেকটি বড় সুবিধা হলো—এই নৌযানগুলো সস্তা। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হওয়ায় নিষেধাজ্ঞার প্রভাবও তুলনামূলক কম। একটি স্পিডবোট ধ্বংস হলে দ্রুত আরেকটি তৈরি করা যায়। কিন্তু সেগুলো ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে হয় অত্যাধুনিক ডেস্ট্রয়ার, হেলিকপ্টার ও ড্রোন।

এক অর্থে এটি অসম অর্থনৈতিক যুদ্ধও। কয়েক লাখ ডলারের নৌকা ঠেকাতে কোটি কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে।

তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীও হাত গুটিয়ে বসে নেই। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক অভিযানে বেশ কয়েকটি দ্রুতগামী নৌকা ধ্বংস করা হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে তারা অভিযান চালাচ্ছে।

এই কৌশল কতদিন কার্যকর থাকবে?

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি দীর্ঘ সময় ধরে এত বড় নৌ উপস্থিতি বজায় রাখতে না পারে, তাহলে ইরানের মশা নৌবহর আবারও সক্রিয় হয়ে উঠবে। কারণ, এই নৌযানগুলো দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারের জন্যই তৈরি করা হয়েছে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের গবেষক ফারজিন নাদিমি বলেন, ‘এই স্পিডবোটগুলো এখানে দীর্ঘ সময় থাকবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিশাল যুদ্ধজাহাজে বহর কতদিন মোতায়েন করে রাখতে পারবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।’

তীব্র গতিতে ছুটতে পারে ইরানের মশা নৌবহরের ছোট ছোট নৌযান। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
তীব্র গতিতে ছুটতে পারে ইরানের মশা নৌবহরের ছোট ছোট নৌযান। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

ইরানের কাছে এটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও। ছোট নৌযানগুলো হয়তো কোনো বিমানবাহী রণতরী ডুবিয়ে দিতে পারবে না, কিন্তু তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দিতে পারে।

এ কারণেই আজ হরমুজ প্রণালির জলে শুধু যুদ্ধজাহাজের লড়াই চলছে না; চলছে ধৈর্য, ভয় এবং অর্থনীতির যুদ্ধও। একদিকে প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তিতে অদ্বিতীয় যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে সীমিত সম্পদ নিয়ে অসম কৌশলে লড়াই করছে ইরান।

সমুদ্রের বুকজুড়ে সেই লড়াইয়ে বড় যুদ্ধজাহাজের গর্জনের চেয়ে কখনো কখনো বেশি ভয় ধরাচ্ছে ক্ষুদ্র, দ্রুতগামী একেকটি নৌযার—যেন অন্ধকার রাতে হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে আসা ‘মশা’। যে মশাকে রোখার সাধ্য নেই কামানের গোলারও!

/বিবি/