শিরোনাম

অঞ্জলি বালা: একজন সফল গর্বিত মা

রেজাউল করিম বিপুল, ফরিদপুর
অঞ্জলি বালা: একজন সফল গর্বিত মা
অঞ্জলি বালা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

সন্তানদের মানুষ করেই থেমে থাকেননি অঞ্জলি বালা। ১৯৮৭ সালে নিজ বাড়িতে ফুলকি নামে সামাজিক শিক্ষামূলক শিশু সংগঠন চালু করেন। সেখানে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের গান, কবিতা, আবৃতি, অঙ্কন, শুদ্ধ উচ্চারণসহ নানা রকম শিক্ষা দেন তিনি।

নিজের ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি অঞ্জলি বালার। তবে সন্তানদের মধ্যে নিজের স্বপ্নগুলো লালন করেছেন। তিনি বলেন, শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে সন্তানদের বড় করে তুলেছি। তারাও আমার স্বপ্ন পূরণ করেছে। তাই জীবনের পড়ন্ত বেলায় নিজেকে সত্যিই গর্বিত মনে হয়।

সংসার জীবনে পাঁচ সন্তানের জননী অঞ্জলি বালা। স্বামী ছিলেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ছিলেন মন্ত্রীও। আন্তর্জাতিক মা দিবসে তিনি বলেন, জন্ম নেওয়া শিশুটি সবার আগে সে তার মাকে চেনে। সন্তানদের মানুষ করতে মায়ের দায়িত্বই সবচেয়ে বেশি। পরিবার তার প্রথম শিক্ষার জায়গা। শিশুদের ছোটবেলা থেকে শৃঙ্খলা শেখাতে না পারলে ব্যর্থ হওয়ায় ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। সব সময় আন্তরিকভাবে সন্তানদের সঙ্গে মিশতে হবে, কথা বলতে হবে, সময় দিতে হবে। বর্তমানে মোবাইল ফোনে আসক্তি বেড়েছে। তা সব সম্পর্ক শেষ করে দিচ্ছে। এই আসক্তির কারণে মায়ার যে বন্ধন তা আর থাকছে না। পরিবারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলে শিশুরা সহজে বিপথগামী হয় না।

তিনি আরও বলেন, আমাদের তেমন সামর্থ্য ছিল না। তিনি (স্বামী) পরিবারে সময় দিতে পারতেন না। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে সন্তানদের পড়িয়েছি। মা দিবসটি পালন প্রত্যেকটি মায়ের জন্য সম্মানের। সম্মান আর ভালোবাসা পেতে হলে শিশুদের সম্মান দিতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে।

সন্তানদের মানুষ করেই থেমে থাকেননি অঞ্জলি বালা। ১৯৮৭ সালে নিজ বাড়িতে ফুলকি নামে সামাজিক শিক্ষামূলক শিশু সংগঠন চালু করেন। সেখানে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের গান, কবিতা, আবৃতি, অঙ্কন, শুদ্ধ উচ্চারণসহ নানা রকম শিক্ষা দেন তিনি।

অঞ্জলি বালা ১৯৩৭ সালে ২২ মার্চ গোপালগঞ্জ সদরের সাহাপুর ইউনিয়নের পাঠিকেলবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম বিরাজ মোহন বিশ্বাস। মাতা রাজলক্ষ্মী বিশ্বাস। তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।

১৯৫২ সালে মাদারীপুরের রাজৈর থানার কদমপুর ইউনিয়নের উল্লাবাড়ী গ্রামের গৌরচন্দ্র বালার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। স্বামী আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। সে সুবাদে বিয়ের পর থেকে ফরিদপুর শহরে বসবাস শুরু করেন। গৌরচন্দ্র বালা ১৯৫৪ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি যুক্তফ্রন্ট সরকারের অধীনে ১৯৫৭ প্রথমে বনমন্ত্রী ও পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৫ সালে রাজনীতি থেকে অবসরে চলে যান। ২০০৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

বর্তমানে ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলী এলাকায় বালা ভবনে বসবাস করেন অঞ্জলি বালা। ৯০ বছর বয়স সত্ত্বেও ‘স্মার্ট’ শব্দটি তার সঙ্গে দারুণ ভাবে যায়। রুচিশীল মানুষ হিসেবে ফরিদপুরের এলিট সোসাইটিতে সুনাম রয়েছে তার।

অঞ্জলি বালার সাক্ষাৎকার নেন সিটিজেন জার্নালের নিজস্ব প্রতিবেদক রেজাউল করিম বিপুল।
অঞ্জলি বালার সাক্ষাৎকার নেন সিটিজেন জার্নালের নিজস্ব প্রতিবেদক রেজাউল করিম বিপুল।

পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে ড. বিপ্লব বালা। কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাটক ও নাট্যতত্ব বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স এবং পিএইচডি করেছেন। তিনি এই বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন।

মেজ ছেলে ডাক্তার প্রণব বালা। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। ইরান ও আয়ারল্যান্ডে দীর্ঘদিন শিশু বিশেষজ্ঞ হিসেবে সেবা দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি ইংলান্ডে বসবাস করছেন।

তৃতীয় সন্তান তন্দ্র বালা। ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছেন। ছিলেন খিলগাঁও মডেল কলেজের অর্থনীতির শিক্ষক। বর্তমানে তিনি স্বামী, সন্তান নিয়ে কানাডায় বসবাস করছেন।

চতুর্থ সন্তান সাংবাদিক পান্না বালা। তিনি ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স-মাস্টার্স করেছেন। তিনি দৈনিক প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক হিসেবে ফরিদপুর থেকে কাজ করছেন।

সবার ছোট মেয়ে তৃপ্তি বালা। তিনিও চিকিৎসক। মংয়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করে মেডিসিন বিষয়ে পিএইচডি করেন। তিনি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক ছিলেন।

নিজের পাঁচ সন্তানকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরে গর্বিত অঞ্জলি বালা।

/এসআর/