শিরোনাম

নকশা অনুমোদনে রাজউকে ‘কমিটি ফাঁদ’

নকশা অনুমোদনে রাজউকে ‘কমিটি ফাঁদ’
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কার্যালয়ে টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না-এমন কথা প্রায়ই শোনা যায়। ভবনের নকশা অনুমোদনসহ নানা কাজে আসা সেবাগ্রহীতাদের কাছে থেকে এই অর্থ আদায় করা হয়। এবার আরও বেশি আর্থিক সুবিধা নেওয়ার জন্য একটি মহল বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। এতে নকশা অনুমোদন কাজে আসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভোগান্তি কয়েক গুণ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগী ও রাজউক কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ নূর-ই-খোদা ‘প্ল্যানিং পারমিট’ নামের এই কমিটি গঠন করেছেন। তিনি ও রাজউকের কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে ইতিমধ্যে এই বিশেষ কমিটির মাধ্যমে নকশা অনুমোদনের নামে হয়রানি শুরু করেছেন।

ফাইল নিয়ে গেলেই বিশেষ কমিটির দর ১০ লাখ থেকে শুরু

প্রজ্ঞাপন বাতিল হলেও বিশেষ কমিটির মারপ্যাঁচে টাকা আদায় অব্যাহত

নতুন করে ‘প্ল্যানিং পারমিট কমিটি’ গঠন

নেতৃত্বে নগরপরিকল্পনাবিদ নূর-ই-খোদা

রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, ৫ একরের ওপরে হলে নগর পরিকল্পনাবিদের মাধ্যমে অনুমোদন নিতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু উপনগর পরিকল্পনাবিদ ( ডিটিপি) যে অনুমোদন দিবে তা তারা কমিটির মাধ্যমে করতে চাচ্ছে। ৫ একরের অধিক পরিমাণের জমিতে আবাসন প্রকল্প, ব্লক ভিত্তিক উন্নয়ন ও বিশেষ ইমারতের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের নগর পরিকল্পনাবিদের অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু বাস্তবে ১০ তলার বেশি ইমারত হলেই বিশেষ কমিটি থেকে অনুমতি নিতে হচ্ছে। যদিও এ বিশেষ কমিটির এ ধরনের এখতিয়ার বাতিল করেছে সরকার। ২০২৫ সালের ঢাকা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) সংশোধনীতে এই ধরনের বিধান রাখা হয়নি।

মূলত এসব ‘কূটকৌশলের’ পেছনে আছেন রাজউকের সদ্য বিদায়ী পরিচালক (প্রশাসন) এবিএম এহসানুল মামুন। এ কর্মকর্তা রাজউকে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। কথিত আছে টাকার পরিবর্তে ডলারে ঘুষ গ্রহণের পদ্ধতি চালু করে আলোচনায় আসেন প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তা। নানা বির্তকের পর সম্প্রতি তাকে সরিয়ে নেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এই বিষয়ে জানতে চাইলে এবিএম এহসানুল মামুন সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘এই ধরণের অভিযোগ সঠিক নয়, বিশেষ কমিটির সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না।’

বেসরকারি একাধিক আবাসন ব্যবসায়ী জানান, আগে এ কমিটি ২ থেকে ৩ লাখ টাকা দিলেই নকশা পাস করতো। আর এখন নকশা পাসের কাজ কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা দিয়ে শুরু করতে হয়। এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ নূর-ই-খোদা। তার সঙ্গে উপনগর পরিকল্পনাবিদ নবায়ন খীসাও যুক্ত হয়েছে।

বেসরকারি একাধিক আবাসন ব্যবসায়ী জানান, আগে এ কমিটি ২ থেকে ৩ লাখ টাকা দিলেই নকশা পাস করতো। আর এখন নকশা পাসের কাজ কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা দিয়ে শুরু করতে হয়। এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ নূর-ই-খোদা। তার সঙ্গে উপনগর পরিকল্পনাবিদ-১ নবায়ন খীসাও যুক্ত হয়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার গঠনের পর নূর-ই-খোদা নিজেকে সরকার দলীয় লোক হিসেবে প্রচার চালাতে শুরু করেন। রাজউক ভবনে হঠাৎ করেই প্রভাবশালী হয়ে ওঠা এ কর্মকর্তা এখতিয়ার বর্হিভূতভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি আবাসন ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন, তার ঘুষ আদায়ের কৌশলও অভিনব। প্রথমে তিনি সভার নামে সময়ক্ষেপণ করে ঘুষের টাকার পরিমাণ নিয়ে দরকষাকষি করতে থাকেন। বনিবনা হলেই সভার সময় নির্ধারণ করা হয়। ফলে নকশা পাস করাতে আসা লোকজন বাধ্য হয়ে নির্ধারিত অঙ্কের ঘুষ দিতে বাধ্য হন।

বিধিমালায় আছে, কর্তৃপক্ষ চাইলে যেকোনো কমিটি গঠন করতে পারে। এই কমিটি অনুমোদনের ক্ষেত্রে ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট, প্ল্যানিংসহ বিভিন্ন বিষয় মূল্যায়ন করে শুধু সুপারিশ করবে
নবায়ন খীসা
উপনগর পরিকল্পনাবিদ-১, রাজউক

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউক সূত্রে জানা যায়, নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ নূর-ই-খোদা ‘প্ল্যানিং পারমিট কমিটি’ নামে নতুন একটি পদ্ধতি নিয়ে হাজির হয়েছেন। যেখানে এ কমিটির মাধ্যমে আরেকটি আর্থিক সুবিধা নেওয়ার ছক কষা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সদস্যরা সম্প্রতি গণপূর্তমন্ত্রী ও রাজউক চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তারা নূর-ই-খোদার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরে এই কমিটি বন্ধ করার দাবি জানান। কর্তৃপক্ষও ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য বুধবার (২৯ এপ্রিল) নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ নূর-ই-খোদার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

তবে উপনগর পরিকল্পনাবিদ-১ নবায়ন খীসা অভিযোগ অস্বীকার করে সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বিধিমালায় আছে, কর্তৃপক্ষ চাইলে যেকোনো কমিটি গঠন করতে পারে। এই কমিটি অনুমোদনের ক্ষেত্রে ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট, প্ল্যানিংসহ বিভিন্ন বিষয় মূল্যায়ন করে শুধু সুপারিশ করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে ফাইল আটকিয়ে রাখার কিছু নেই। প্রায় দুই মাস আগে এই কমিটি গঠন করা হলেও আমাদের কাজ শুরু হয়েছে কিছুদিন আগে। ৮ ঘণ্টা ডিউটি করে যতটুকু করা সম্ভব, তা আমরা করছি।’

/এসএ/